বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৯ অপরাহ্ন
তিন দশকের বসত একদিনেই গুঁড়িয়ে দিল প্রতিপক্ষ!
বোয়ালমারী প্রতিনিধি
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নে জমি দখলকে কেন্দ্র করে ঘটে গেছে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক ঘটনা। দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ অবশেষে রূপ নেয় সহিংসতায়, যার ফলে একটি পরিবার ঘরছাড়া হয়ে পড়েছে, এবং বসতবাড়ি ভেঙে লুটপাটের অভিযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনপদ।
ঘটনার শিকার পরিবারের সদস্য মোহাম্মদ শেখ জানান, তার পিতা মৃত ইসমাইল শেখের নামে থাকা ১৬ শতাংশ জমিতে তারা গত ৩০ বছর ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন। তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৯৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ভানুমতি নামের এক নারী থেকে ৭ শতাংশ এবং ২০০৩ সালের ২৭ মে আরজন শেখের কাছ থেকে আরও ১২ শতাংশ জমি ক্রয় করেন তারা, যা নিয়মিত খাজনা পরিশোধের মাধ্যমে ভোগদখলে রাখেন। অথচ হঠাৎ করেই ওই জমির ওপর মালিকানা দাবি করতে শুরু করেন স্থানীয় সালাম শেখ নামের এক ব্যক্তি, যিনি দাবি করছেন, ওই জমির একটি অংশ বিএস রেকর্ড অনুযায়ী তার নামে অন্তর্ভুক্ত এবং তিনি এটি আজিজ মিলিটারির কাছ থেকে এয়াজ বদলের মাধ্যমে পেয়েছেন।
বিরোধের সূত্রপাত থেকেই উত্তেজনা দানা বাঁধতে থাকে, যা অবশেষে গত ১৫ মে (বৃহস্পতিবার) সহিংস আকার ধারণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, সালাম শেখের ছেলে মুরাদ শেখ ও তার সহযোগী ফুরাদসহ একদল লোকজন দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালিয়ে মোহাম্মদ শেখের বসতবাড়ি ভাঙচুর করে, ঘর থেকে টিন, খুঁটি, দরজা, জানালা এমনকি আসবাবপত্রও সরিয়ে নিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, নগদ টাকা এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী লুটপাট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। পরিবারটি দাবি করছে, প্রতিপক্ষের এই হামলায় তাদের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাণভয়ে মোহাম্মদ শেখ ও তার ভাতিজারা ঘর ছেড়ে পালিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, এবং বর্তমানে বাড়িতে কেবল নারী সদস্যরা রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, প্রতিপক্ষের লোকজন শুধু ভাঙচুর বা লুটপাটেই থেমে থাকেনি, বরং তাদের খুঁজে পেলে মারধরের হুমকি দিচ্ছে এবং পুরো এলাকায় তারা একপ্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। তারা জানিয়েছেন, জমি সংক্রান্ত একটি রেকর্ড সংশোধনের মামলা আদালতে চলমান রয়েছে, এবং মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কেউ জমি দখল করতে পারে না। আইন অনুযায়ী এটি বেআইনি হলেও প্রতিপক্ষ জোরপূর্বক সেই জমি দখল করে নিয়েছে।
অন্যদিকে সালাম শেখ তার দাবিতে অনড়। তিনি জানান, তার নামে বিএস রেকর্ডভুক্ত ১২ শতাংশ জমি রয়েছে এবং এই জমি পূর্বে আজিজ মিলিটারির নামে ছিল, যা তিনি বৈধ প্রক্রিয়ায় এয়াজ বদলের মাধ্যমে পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, গ্রামবাসীর সহযোগিতায় তিনি ওই জমি দখলে নিয়েছেন এবং এর পেছনে কোনো বেআইনিতা নেই বলে দাবি করেন।
বিষয়টি নিয়ে বোয়ালমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাংবাদিকদের জানান, তারা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ বসবাস হঠাৎ করে এমন সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখন ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার আশায় প্রশাসনের দিকে চেয়ে আছে। জমির মালিকানা নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষকেই সংযম বজায় রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও সামনে চলে এসেছে গ্রামীণ এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং নিরীহ পরিবার কীভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়তে পারে, তার এক করুণ চিত্র।